প্রকাশ: ... | ... | ...

সম্পত্তি হস্তান্তর ও দানপত্র বা হেবা আইন বনাম ইসলামী শরীয়া আইন


সংযুক্ত ছবি

সম্পত্তি হস্তান্তর ও দানপত্র বা হেবা আইন বনাম ইসলামী শরীয়া আইন | ছবি: বাংলাদেশ যুগান্তর

বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা, সম্পত্তি হস্তান্তর এবং পারিবারিক অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে দানপত্র বা ‘হেবা’ দলিল রেজিস্ট্রি নিয়ে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বা আলোচিত নতুন আইনগত বিধান দেশজুড়ে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্রস্তাবিত বা আলোচিত এই বিধান অনুযায়ী, দান সংক্রান্ত দলিল রেজিস্ট্রি করার পরও দাতার জীবদ্দশায় নয়, বরং তাঁর মৃত্যুর পরেই সম্পত্তির দখল হস্তান্তরিত হবে। এই আইন প্রণয়নের পেছনে বয়স্ক পিতা-মাতা ও দাতাদের আইনি সুরক্ষা এবং প্রতারণা রোধের সদুদ্দেশ্য থাকার কথা বলা হলেও, ইসলামী শরিয়ত, পবিত্র কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতি এবং যুগ যুগ ধরে চলে আসা উত্তরাধিকার বা ফারায়েজের বিধানের সাথে এর সরাসরি সাংঘর্ষিক অবস্থান নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন দেশের মুহাক্কেক আলেম সমাজ ও সচেতন মুসলিম জনগোষ্ঠী। ইসলামী ফিকহ এবং প্রধানত হানাফি মাজহাবের সুনির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী, কোনো সম্পত্তি অপর কাউকে দান বা হেবা করার ক্ষেত্রে তিনটি মৌলিক শর্ত পূরণ করা আবশ্যক: প্রথমত, দাতার পক্ষ থেকে দানের স্পষ্ট ঘোষণা (ইযাব); দ্বিতীয়ত, গ্রহীতার পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করা (কবুল); এবং তৃতীয়ত, দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তির বাস্তব দখল বা ‘কবজা’ গ্রহীতাকে বুঝিয়ে দেওয়া। ইসলামী আইন স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করে যে, দানপত্র বা হেবা তখনই পূর্ণতা পায় যখন দাতার পূর্ণ ইচ্ছায় ও জীবদ্দশায় গ্রহীতা সেই সম্পত্তির প্রকৃত দখল বুঝে পান। যদি দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার পরও দখল হস্তান্তরের বিষয়টি দাতার মৃত্যুর পর পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়, তবে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে পূর্ণাঙ্গ ‘হেবা’ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। এটি তখন ইসলামী পরিভাষায় সরাসরি ‘ওসিয়ত’ (Will)-এর রূপ ধারণ করে। পবিত্র কোরআনুল কারিমে মানবসম্পদের মালিকানা, অন্যের হক এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করার বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করা বা শরিয়তবহির্ভূত উপায়ে মালিকানা হস্তান্তরের পথ উন্মুক্ত করার বিরুদ্ধে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: “আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের সম্পদের কিয়দংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের সামনে পেশ করো না।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৮) ইসলাম ধর্মে মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের জন্য অত্যন্ত নিখুঁত, সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় উত্তরাধিকার আইন বা ‘ফারায়েজের বিধান’ রয়েছে। সূরা আন-নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে প্রতিটি ওয়ারিশের অংশ কত হবে, তা আল্লাহ নিজেই সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এরপর কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে: “এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করে এবং তাঁর সীমা লঙ্ঘন করে, তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন, যাতে সে চিরকাল থাকবে। আর তার জন্যই রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪) জীবদ্দশায় প্রকৃত দখল হস্তান্তর না করে মৃত্যুর পর কার্যকর করার এই আইনি বিধান পরোক্ষভাবে ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার বা শরিয়তের নির্ধারিত ফারায়েজের বিধানকে পাশ কাটিয়ে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি আইনগত ফাঁকফোকর তৈরি করতে পারে, যা সরাসরি আল্লাহর নির্ধারিত সীমানা লঙ্ঘনের শামুক। হাদিস শরিফে দান ও সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ইনসাফ এবং স্বচ্ছতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেও দানের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব রোধে কঠোর নির্দেশনা ছিল। বিখ্যাত সাহাবি হযরত নুমান বিন বাশির (রা.)-এর একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি তাঁর এক সন্তানকে একটি সম্পত্তি দান করতে চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “তুমি কি তোমার সব সন্তানকেই এমন দান করেছ?” তিনি ‘না’ বলায় রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন, “আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করো।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। এই হাদিস প্রমাণ করে যে, দানের ক্ষেত্রে পক্ষপাত বা শরিয়তবিরোধী শর্তের কোনো অবকাশ নেই। এছাড়া, বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের জীবন, সম্মান ও সম্পত্তির পবিত্রতা ঘোষণা করে স্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেছেন: “নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান একে অপরের জন্য চিরতরে পবিত্র ও সম্মানিত।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) । অন্যদিকে, ইসলামী শরিয়তে ওয়ারিশদের অধিকার সুরক্ষার সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হলো—কোনো ওয়ারিশের অনুকূলে ওসিয়ত (উইল) করা নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক হকদারের হক নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং কোনো ওয়ারিশের জন্য কোনো ওসিয়ত নেই।” (সুনান আত-তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ) হেবা দলিলের মাধ্যমে যদি মৃত্যুর পর দখল হস্তান্তরের আইনি সুযোগ রাখা হয়, তবে তা পরোক্ষভাবে ওয়ারিশদের জন্য অননুমোদিত ওসিয়তের পথ খুলে দেয়, যা শরিয়তের মৌলিক কাঠামোর সাথে সরাসরি সংঘর্ষ তৈরি করে। আইন প্রণেতা ও নীতিনির্ধারকদের দিক থেকে এই ধরনের আইন প্রণয়নের পেছনের যুক্তিটি মূলত সামাজিক বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সমাজে প্রায়শই দেখা যায়, বয়স্ক পিতা-মাতা বা প্রবীণ ব্যক্তিরা ভালোবেসে তাদের সন্তান বা আত্মীয়দের নামে জমি বা সম্পত্তি দানপত্র রেজিস্ট্রি করে দেন। কিন্তু দলিল ও নামজারি সম্পন্ন হওয়ার পরই গ্রহীতারা (অনেক ক্ষেত্রে অকৃতজ্ঞ সন্তানরা) দাতাদের অবহেলা করতে শুরু করেন, ঘর থেকে বের করে দেন কিংবা ভরণপোষণ বন্ধ করে দেন। বর্তমান দেওয়ানি আইনে একবার দানপত্র রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে তা বাতিল করা অত্যন্ত দুরূহ ও দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াইয়ের বিষয়। বয়স্ক নাগরিকদের বাসস্থান, জীবিকা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার এই সৎ উদ্দেশ্য প্রশংসনীয় হলেও, তা বাস্তবায়নের জন্য পবিত্র কোরআন-সুন্নাহ ও ইসলামী শরিয়তের মূল বিধানকে পাশ কাটানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শরিয়তের বিধান অমান্য করে এমন কোনো আইন প্রণয়ন করা হলে তা সমাজে দীর্ঘমেয়াদী পারিবারিক বিশৃঙ্খলা, আইনি জটিলতা এবং আখিরাতের জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে ভয়াবহ সংকট তৈরি করবে। একটি জনবান্ধব রাষ্ট্রে প্রবীণ ও বয়স্ক নাগরিকদের অধিকার এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি দেশের নিরানব্বই ভাগ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, পবিত্র কোরআন-হাদিসের শাশ্বত বিধান এবং ইসলামী শরিয়তের মূলনীতির সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমানভাবে অপরিহার্য। তাই আইন প্রণেতা ও নীতিনির্ধারকদের উচিত আলেম সমাজ, আইন বিশেষজ্ঞ এবং অংশীজনদের সাথে নিয়ে এমন একটি মধ্যমপন্থা বা বিকল্প আইনি সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করা—যা একদিকে যেমন বয়স্ক বাবা-মাকে প্রতারণা ও অবহেলা থেকে রক্ষা করবে, অন্যদিকে তেমনি ইসলামী শরিয়তের হেবা ও উত্তরাধিকার বিধানের সাথেও কোনো ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করবে না। জনগণের ধর্মীয় অনুভূতি ও শরিয়তের অকাট্য বিধানকে সম্মান জানিয়ে এই অগ্রহণযোগ্য আইন অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা ও বাতিল করা সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি। লেখক ইদ্রিস মাদানী লেখক গবেষক কলামিস্ট।।