প্রকাশ: ... | ... | ...

১০৮ কোটি টাকার টেন্ডারে কারসাজি?


সংযুক্ত ছবি

১০৮ কোটি টাকার টেন্ডারে কারসাজি? | ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১০৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার একটি ক্রয়চুক্তি নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ট্রেজারার ও প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে টেন্ডার কারসাজি ও যোগসাজশের অভিযোগও উঠে এসেছে। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে জবাবদিহি নিয়ে। প্রায় ১০৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার সরকারি ক্রয়। আর এই ক্রয়প্রক্রিয়াতেই অনিয়ম, প্রতিযোগিতা সীমিত করা এবং টেন্ডার কারসাজির অভিযোগ। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের মামলা নং ০৩/২০২৫-এর অনুসন্ধান প্রতিবেদনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ, ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এ টি এম জাফরুল আজম এবং প্রধান প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২-এর ১৫ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই তদন্তে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড এবং প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের বিরুদ্ধেও টেন্ডার কারসাজি ও যোগসাজশের অভিযোগ উঠে এসেছে। ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় লিথোকোড ও কিউআর কোডযুক্ত ওএমআর ফরম ও উত্তরপত্র সরবরাহের জন্য দুটি লটে দরপত্র আহ্বান করে। দরপত্রে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও কারিগরি মূল্যায়নে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। শেষ পর্যন্ত একটি করে লটের কাজ পায় মাস্টার সিমেক্স এবং প্রিন্ট মাস্টার। প্রথম লটে মাস্টার সিমেক্সকে দেওয়া হয় ৫৪ কোটি ৩৪ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকার কার্যাদেশ। দ্বিতীয় লটে প্রিন্ট মাস্টার পায় ৫৪ কোটি ২৫ লাখ ৭৭ হাজার ৫০০ টাকার কাজ। সব মিলিয়ে চুক্তির মূল্য প্রায় ১০৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, যাতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে যায় এবং নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়ার সুযোগ পায়। এখানেই শেষ নয়। সরকারি আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ বিধি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ক্রয় অনুমোদনের ক্ষমতা সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত। ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুমোদনের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের। আর ৫০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের ক্রয়চুক্তির অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির। কিন্তু তদন্তে বলা হয়েছে, এই বিধান অনুসরণ না করে উপাচার্য নিজেই প্রায় ১০৮ কোটি টাকার ক্রয় অনুমোদন করেন। দরপত্রের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। বিজ্ঞপ্তিতে ওপেন টেন্ডারিং মেথড বা ওটিএমের কথা থাকলেও বাস্তবে ব্যবহার করা হয় অন্য ধরনের স্ট্যান্ডার্ড টেন্ডার ডকুমেন্ট। পরে চুক্তিতে সেটিকে আবার ফ্রেমওয়ার্ক কন্ট্রাক্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া যোগ্যতার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শর্ত আরোপের অভিযোগও রয়েছে। এতে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে অযোগ্য ঘোষণা করা হলেও তাদের অযোগ্য ঘোষণার যথেষ্ট ব্যাখ্যা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ছিল না বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে কমিশন দেখেছে দুই প্রতিষ্ঠানের মূল্য প্রস্তাবের ধরন। এক লটে একটি প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হলে অন্যটি ছিল দ্বিতীয়; আবার অন্য লটে চিত্রটি উল্টো। কমিশনের মতে, এটি পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগির ইঙ্গিত দিতে পারে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কিংবা আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, তদন্তে অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ার পর ব্যবস্থা না নেওয়া উদ্বেগজনক। তিনি দ্রুত তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, নিয়ম মেনেই তারা কাজ পেয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলীও কমিশনকে জানিয়েছেন, জরুরি প্রয়োজনে সরল বিশ্বাসে ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এতে অনিয়ম হয়নি। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে সব সরকারি ক্রয় ই-জিপির আওতায় আনা, প্রতিযোগিতা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং প্রযুক্তিনির্ভরভাবে টেন্ডার কারসাজি শনাক্তের সুপারিশ করেছে প্রতিযোগিতা কমিশন। এখন প্রশ্ন—তদন্তে অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসার পরও কেন এক বছরের বেশি সময় ধরে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? আর সরকারি ক্রয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই বা কবে পদক্ষেপ নেয়—সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।