প্রকাশ: ... | ... | ...

অভ্যুত্থানে সরকার পতনের ১ দিন পরেই জামালপুর পবিসে 'কার্টেল জালিয়াতি'


সংযুক্ত ছবি

অভ্যুত্থানে সরকার পতনের ১ দিন পরেই জামালপুর পবিসে 'কার্টেল জালিয়াতি' | ছবি: বাংলাদেশ যুগান্তর

ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সরকার পতনের পর সারাদেশে যখন চরম প্রশাসনিক শূন্যতা বিরাজ করছিল এবং ৮ আগস্ট রাতে বঙ্গভবনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল—ঠিক সেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের সুযোগে জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে (পবিস) তড়িঘড়ি করে সই হয়েছে একই অঙ্কের ৬টি পৃথক বিদ্যুৎ লাইন সংস্কার চুক্তি। সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সদর দপ্তরে বসে ১০ কিলোমিটার করে ওভারহেড বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন সংস্কারের ৬টি আলাদা চুক্তিতে একই দিনে সই করেছেন তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) ও বর্তমান শরীয়তপুর পবিসের সিনিয়র জিএম খন্দকার শামীম আলম। ৬ প্রজেক্টে হুবহু একই দর: সংগৃহীত টেন্ডার নথি অনুযায়ী (99**5, 99*0, 99*0, 97*6, 99*9 এবং 99**5), জামালপুর পবিসের অধীনে ৬টি ভিন্ন জেলার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এই ৬টি প্রজেক্টের কাজ পান নওগাঁর মো: জাহিদ আহসান পিয়াল, জামালপুরের আজমাইন ইঞ্জিনিয়ার্স, টাঙ্গাইলের এজাজ অ্যান্ড ব্রাদার্স, ময়মনসিংহের বুশরা ইঞ্জিনিয়ারিং, নাটোরের ফয়সাল এন্টারপ্রাইজ এবং কুষ্টিয়ার এনার্জি বিল্ডার্স। অফিশিয়াল নথিতে দেখা যায়, ৬টি ভিন্ন জেলার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত চুক্তি মূল্য একদম কাঁটায় কাঁটায় হুবহু ৬,৬৫,০০০.০০০ টাকা (ছয় লাখ ৬৫ হাজার টাকা)। অর্থাৎ ৬টি টেন্ডারে মোট ৩৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার (প্রায় ৪০ লাখ টাকা) কাজ বণ্টন করা হয়েছে। প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা দরপত্রে ৬টি আলাদা জেলার ঠিকাদারের প্রস্তাবিত দর পয়সায় পয়সায় মিল রেখে হুবহু একই হওয়া গাণিতিকভাবে অসম্ভব। এটি প্রমাণ করে—আগে থেকেই ঠিকাদারদের ফিক্সড রেট জানিয়ে দিয়ে সিন্ডিকেট করে কাজ ভাগবাটোয়ারা (Cartel Bidding) করা হয়েছে। বোর্ডের অনুমোদন এড়াতে ‘প্যাকেজ স্প্লিটিং’: পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (PPA-2006) অনুযায়ী, প্রজেক্টের মোট বাজেট বড় হলে তা বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (REB) মূল বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়। অভিযোগ উঠেছে, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এড়াতে প্রায় ৬০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইনের বড় কাজকে কৃত্রিমভাবে ১০ কিলোমিটার করে ৬টি ছোট টুকরো (Package: W-23-24.23.08.1 থেকে 13.1) করা হয়েছে। এতে প্রতিটি প্যাকেজের বাজেট ৭ লাখ টাকার নিচে নেমে আসায় জিএম নিজের প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই একক স্বাক্ষরে সই করার সুযোগ পান। পারফরম্যান্স সিকিউরিটি জমা: সরকারি নিয়ম অনুযায়ী চুক্তি সইয়ের আগে বিজয়ী ঠিকাদারকে ব্যাংকে গিয়ে পারফরম্যান্স সিকিউরিটি বা পে-অর্ডার জমা দিতে হয়। ৫ থেকে ৭ আগস্ট সারাদেশে ব্যাংক লেনদেন বন্ধ ও স্থবির থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদাররা কীভাবে ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিলেন এবং পবিসের কর্মকর্তারা কীভাবে তা অনলাইনে ভেরিফাই করে সই করলেন—তা নিয়ে বড় ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। সাবেক জিএম খন্দকার শামীম আলমের বক্তব্য: সরকার পতনের পর ৭ আগস্ট 2024 অফিসে বসে ৬ প্রজেক্টে হুবহু একই দরে (৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকা) সই করার বিষয়ে জানতে চাইলে জামালপুর পবিসের তৎকালীন জিএম ও বর্তমানে শরীয়তপুর পবিসের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার খন্দকার শামীম আলম বলেন, "সেই সময়ের নির্দিষ্ট বিষয়টি এখন আমার খেয়াল নেই, ফাইল না দেখে বলতে পারবো না। তবে আমার জানা মতে, যারা প্রসেস করে দিয়েছে তারা সঠিকভাবে দেওয়ার কথা। আর ব্যাংক বন্ধ থাকলেও পারফরম্যান্স সিকিউরিটির কাগজ ব্যাংক খোলার তারিখেই হওয়ার কথা। তৎকালীন কারিগরি উইংয়ের ফাইলগুলো যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেভাবেই দেওয়া হয়েছে।" ডিজিএম (টেকনিক্যাল) মাহমুদুল হাসানের বক্তব্য: কারিগরি প্রসেসিংয়ের বিষয়ে জামালপুর পবিসের তৎকালীন ডিজিএম (কারিগরি) ও বর্তমানে চট্টগ্রাম পবিস-৩ এর ডিজিএম মাহমুদুল হাসান বলেন, "লাইন রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি বিদ্যুৎ সচল রাখতে এলটিএম (LTM) পদ্ধতিতে নিজস্ব তালিকাভুক্ত ঠিকাদারদের মাধ্যমে এসব কাজ করা হয়। এসব টেন্ডারের সময়সূচি ই-জিপিতে আগেই নির্ধারিত বা ফিক্স করা থাকে। ই-জিপির নির্ধারিত নিয়ম ও সময়সূচি মেনেই ফাইল প্রসেস করা হয়েছে।" তবে প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিলে বকেয়া প্রজেক্টগুলো স্থগিত বা বাতিল হতে পারে—এমন আশঙ্কায় সরকারি টাকা আটকে (Fund Lock) ফেলতেই জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী ক্ষমতার শূন্যতার সুযোগে তড়িঘড়ি ব্যাকডেটেড সই করা হয়ে থাকতে পারে।