দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধগতিতে দিশেহারা নিম্ন আয়ের মানুষ গুলো | ছবি: বাংলাদেশ যুগান্তর
নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ। ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ঢাকা ও কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন বাজারগুলো ঘুরে দেখা যায়, প্রতিদিন কেনাকাটা করতে এসে বাধ্য হয়ে তালিকা কাটছাঁট করে ঘরে ফিরতে হচ্ছে অনেককে। কেরানীগঞ্জের ঐতিহাসিক জিনজিরা বাজার, আগানগর বাজার এবং গোলাম বাজারে সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, একান্ত প্রয়োজনীয় পণ্যগুলোও ক্রেতাদের কিনতে হচ্ছে চড়া দামে, যা তাদের আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাজধানী ও কেরানীগঞ্জের খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ক্রেতাদের কেনাকাটার ধরন ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। জিনজিরা বাজারের মুদি বিক্রেতা আহাদ আলী বলেন, ‘বাজারে ক্রেতা খুবই কম। সবাই হিসেব কষে কেনাকাটা করছেন। আমরা পাইকারিতেই যে দামে পণ্য কিনছি, তার চেয়ে কমে তো বিক্রি করার সুযোগ নেই। গত এক বছরে পাম তেল ও পোলাওয়ের চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে ১২০ থেকে ১২৫ টাকা দরে পাইকারিতে পাম তেল কিনতাম, এখন তা খুচরায় ১৮৫ থেকে ১৮৬ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।’ আগানগর বাজারের মাছ ও সবজি বিক্রেতা শাকিল জানান, তিন-চার বছর আগেও ১৮০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে পুরো পরিবারের জন্য মোটামুটি বাজার করা যেত। এখন শুধু দৈনিক সবজি কিনতেই প্রায় ৫০০ টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে সংকটে পড়েছেন দিনমজুর ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। গোলাম বাজারে বাজার করতে আসা দিনমজুর আমীন আলী তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আগে কাজ করে দিনে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আয় হতো। এখন কাজ পাওয়া কঠিন, পেলেও দিনে মাত্র চার-পাঁচশ টাকা হাতে আসে। এই টাকায় সংসার চালানো, সন্তানের পড়াশোনা আর রান্নার জ্বালানি খরচ মেটানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের জন্য চাল, ডাল, তেল আর আলুর দাম কমলেই যথেষ্ট; মাংস তো এখন বড় লোকদের খাবার। কেজি ৮০০ টাকার গরুর মাংস কিনলে চাল-তেল কেনার টাকা থাকে না।’ পরিবারের ব্যয় সামলাতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হয়ে বিকল্প পথ খুঁজছেন। সেলাইয়ের কাজ করা মিলন জানান, তিন সন্তানের ভরণপোষণ ও বাজারে পণ্যের বাড়তি দামের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে বাধ্য হয়ে স্ত্রীকে কাজে পাঠিয়েছেন। অন্যদিকে, ঢাকা ও কেরানীগঞ্জের অনেক এলাকায় রান্নার গ্যাসের সংকট ও বিকল্প জ্বালানির বাড়তি খরচে পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সার্বিক বাজার পরিস্থিতি ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়ে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বাড়তি দ্রব্যমূল্যের চাপ সচ্ছল মানুষ কোনোমতে সামাল দিতে পারলেও নিম্ন আয়ের মানুষের সেই সুযোগ নেই। ফলে তাদের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া নিয়মিত বিল দিয়েও গ্যাস না পাওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়, এখানে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।’ অন্যদিকে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে কয়েক দফা হাতবদল ও পরিবহন খরচের কারণে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। চালের দাম জাত ও মানভেদে ভিন্ন এবং ভোজ্যতেলের দাম সরকার নির্ধারণ করে দিচ্ছে। বাজারে চাল নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কিনা, তা তদারকি করতে অধিদপ্তর নিয়মিত নজর রাখছে।’