শিরোনাম

চকবাজারের ঐতিহাসিক ‘জাহাজবাড়ি’: সংরক্ষণের অভাবে বিলীন পুরান ঢাকার স্থাপত্য ঐতিহ্য

আব্দুর রহমান মোল্লা আব্দুর রহমান মোল্লা
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
চকবাজারের ঐতিহাসিক ‘জাহাজবাড়ি’: সংরক্ষণের অভাবে বিলীন পুরান ঢাকার স্থাপত্য ঐতিহ্য ছবি: সংগৃহীত
চকবাজারের ঐতিহাসিক ‘জাহাজবাড়ি’: সংরক্ষণের অভাবে বিলীন পুরান ঢাকার স্থাপত্য ঐতিহ্য ছবি: সংগৃহীত

চকবাজারের অলিগলি কিংবা ঐতিহাসিক জাহাজঘাটে পা বাড়ালেই যেন অনুভবে ভেসে ওঠে ঢাকা শহরের হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন স্থাপত্যের দীর্ঘশ্বাস। বহুকাল ধরে পুরান ঢাকার কৃষ্টি ও ইতিহাসের নিরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ঐতিহ্যবাহী ‘জাহাজবাড়ি’। তবে নগর সম্প্রসারণের তাগিদ ও সংরক্ষণের চরম উদাসীনতায় শত বছরের এই স্মারকের অস্তিত্ব আজ শুধুই ইতিহাস।

​ঐতিহাসিক নথি ও তথ্য অনুযায়ী, আনুমানিক ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে চকবাজারের প্রাণকেন্দ্রে ভবনটি নির্মিত হয়। স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে কাঠামোটি ছিল এক অসাধারণ সংযোজন। ভবনটির সম্মুখভাগে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন খিলান, সুবিন্যস্ত স্তম্ভ এবং মুঘল ও ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক নকশার মেলবন্ধন একে তৎকালীন ঢাকার অন্যতম আকর্ষণীয় ইমারতে পরিণত করেছিল। কাঠামোগত বিশেষ অবয়বের কারণে এটি সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিতি পায় ‘জাহাজবাড়ি’ নামে।

​তবে ঐতিহ্য সুরক্ষার স্থায়ী নীতিমালার অভাব ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের কারণে ঐতিহাসিক ভবনটি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ২০১৯ সালের ঈদের রাতে ভবনটি ভেঙে ফেলার পর চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত হয় প্রাচীন স্থাপত্যের এই স্মৃতি চিহ্নটি। স্থানীয় সচেতন মহল ও ঐতিহ্যপ্রেমীদের নানা উদ্বেগ ও প্রতিবাদের পরেও ভবনটির বিলুপ্তি রোধ করা যায়নি। ​আজ ১৯ অক্টোবর ২০২৬ (সোমবার) চকবাজার ও জাহাজঘাট এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী জাহাজবাড়ির কোনো দৃশ্যমান অবয়ব আর অবশিষ্ট নেই। যেখানে একসময় অনন্য স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন ছিল, সেখানে এখন কোলাহলপূর্ণ বাণিজ্যিক পরিবেশ ও নতুন কাঠামোর ব্যাপ্তি।

​এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বললে তাঁরা স্মৃতিচারণ করে ক্ষোভ ও আফসোস প্রকাশ করেন। এক প্রবীণ অধিবাসী জানান, জাহাজবাড়িটি কেবল ইট-পাথরের ভবন ছিল না, এটি ছিল পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক নান্দনিকতার পরিচয়। হঠাৎ করে তা ভেঙে ফেলায় পুরান ঢাকার একটি অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ববাহী অধ্যায় চিরতরে মুছে গেছে।

​পরিকল্পিত সংরক্ষণের অভাবে এভাবে বারবার প্রাচীন স্থাপনা বিলুপ্ত হওয়ায় ঢাকার ঐতিহাসিক চরিত্র যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি নতুন প্রজন্মও বঞ্চিত হচ্ছে নিজেদের শিকড় ও নিজস্ব ইতিহাস জানার সুযোগ থেকে। নগর গবেষকদের মতে, ঢাকার মতো প্রাচীন নগরীর ইতিহাস টিকিয়ে রাখতে হলে বাকি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো অবিলম্বে প্রত্নতত্ত্ব আইনের অধীনে সুরক্ষা দেওয়া জরুরি। ভবনটির বস্তুগত অস্তিত্ব হয়তো মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ঐতিহ্যপ্রেমী নগরবাসীর স্মৃতিতে ‘জাহাজবাড়ি’ আজ অবিনশ্বর। প্রশ্ন থেকে যায়, ইতিহাসের এই অমূল্য ক্ষতি থেকে শিক্ষা নিয়ে পুরান ঢাকার অন্যান্য ঐতিহাসিক নিদর্শন সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে কি না।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL