প্রেরণায় নজরুল, চেতনায় জুলাই’—জাতীয় আবৃত্তি পরিষদের আয়োজনে মনোজ্ঞ আবৃত্তি ও আলোচনা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিবর্গ | ছবি: বাংলাদেশ যুগান্তর
‘প্রেরণায় নজরুল, চেতনায় জুলাই’—এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে বাংলাদেশ জাতীয় আবৃত্তি পরিষদের আয়োজনে রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে মনোজ্ঞ আবৃত্তি ও আলোচনা অনুষ্ঠান। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সন্ধ্যায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। নজরুলের দ্রোহ, সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তির চেতনার সঙ্গে জুলাইয়ের জাগরণকে সংযুক্ত করে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ও দৈনিক বাংলাদেশ যুগান্তর পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক এবং জাসাস কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত চিত্রনায়ক হেলাল খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন, কেন্দ্রীয় জাসাসের সদস্য সচিব জাকির হোসেন রোকন, জাসাসের যুগ্ম আহ্বায়ক লিয়াকত আলী, রফিকুল ইসলাম, জামাল উদ্দিন নাসির ও ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন; ঢাকা মহানগর উত্তর জাসাসের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম স্বপন; কেন্দ্রীয় জাসাসের সদস্য অধ্যক্ষ শাহীন ও শিহাব খান; এবং আবৃত্তি ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদী হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান। অনুষ্ঠানে দেশের বরেণ্য আবৃত্তিশিল্পীরা কবিতা ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ফারহানা তৃণা, শহীদুজ্জামান খান, আলী আহাম্মেদ, শাহনাজ পারভীন লিপি, অনন্যা মাহমুদ, টিটো মুন্সী, তাহসিন রেজা, শ্রাবণী আক্তার, দীপ্তীসহ আরও অনেকে। শিল্পীদের আবৃত্তিতে উঠে আসে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী সাহিত্যকর্মের বিভিন্ন দিক। তাঁর কবিতার দ্রোহ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান, সাম্য ও মানবতার আহ্বান এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা অনুষ্ঠানের আবৃত্তি পর্বকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। আলোচনা পর্বেও নজরুলের চেতনা ও সমকালীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বাস্তবতা নিয়ে বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। বক্তারা নজরুলের সাহিত্য ও দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও ব্যাপকভাবে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে সমাজে মানবিক মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের আকাঙ্ক্ষাকে শক্তিশালী করার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পায়। অনুষ্ঠানের আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, নজরুলের সাহিত্য ও সৃষ্টিশীলতার মূল শক্তি ছিল মানুষের মুক্তি, সাম্য, ভালোবাসা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। সেই চেতনাকে ধারণ করেই ‘প্রেরণায় নজরুল, চেতনায় জুলাই’ স্লোগানটি সামনে রেখে এ আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় আবৃত্তি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কবি এনামুল হক জুয়েল-এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি পরিচালিত হয়। সংগঠনের সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। সঞ্চালনার মাধ্যমে পুরো আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তোলেন কবি এনামুল হক জুয়েল। সভাপতির বক্তব্য ও অতিথিদের আলোচনার পাশাপাশি শিল্পীদের আবৃত্তি অনুষ্ঠানটিতে ভিন্নমাত্রা যোগ করে। উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা মনোযোগ দিয়ে আবৃত্তি উপভোগ করেন এবং শিল্পীদের পরিবেশনায় মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। আয়োজকরা মনে করেন, আবৃত্তি শুধু কবিতা পরিবেশনের শিল্প নয়; এটি মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও বিবেককে জাগ্রত করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। অন্যায়, বৈষম্য ও অসাম্যের বিরুদ্ধে মানুষের কণ্ঠকে আরও দৃঢ় করতে আবৃত্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সেই লক্ষ্যেই আবৃত্তিকে গণমানুষের কাছে আরও ব্যাপকভাবে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে নজরুলের দ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও মুক্তির চেতনার সঙ্গে জুলাইয়ের জাগরণ ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যয়ের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে। কবিতা ও আবৃত্তির মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার চেতনাকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানের শেষদিকে দেশের আবৃত্তি আন্দোলনকে আরও বেগবান করা এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের আবৃত্তিচর্চায় সম্পৃক্ত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে আবৃত্তিকে রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। সব মিলিয়ে ‘প্রেরণায় নজরুল, চেতনায় জুলাই’ শীর্ষক এ আয়োজন হয়ে ওঠে কবিতা, সংস্কৃতি ও চেতনার এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা। আবৃত্তিশিল্পীদের কণ্ঠে নজরুলের চিরন্তন বাণী ও সমকালীন চেতনার প্রকাশ উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে সৃষ্টি করে ভিন্নধর্মী আবেগ ও অনুপ্রেরণা। আয়োজনের মূল প্রত্যয়—“আবৃত্তি হোক গণমানুষের মুক্তির সোপান।