শিরোনাম

কওমী সমাজ ও দেওবন্দী মাসলাক

কোনো ব্যক্তির নাম নয়, একটি ঐতিহ্যবাহী চলমান কাফেলা 

মুফতি ফয়জুল হক জালালাবাদী-সিলেট:
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
কোনো ব্যক্তির নাম নয়, একটি ঐতিহ্যবাহী চলমান কাফেলা ছবি: বাংলাদেশ যুগান্তর
কোনো ব্যক্তির নাম নয়, একটি ঐতিহ্যবাহী চলমান কাফেলা ছবি: বাংলাদেশ যুগান্তর

কওমী সমাজ বা দেওবন্দী মাসলাক—এটি কোনো একক ব্যক্তির নাম নয়, কোনো সাময়িক রাজনৈতিক পরিচয়ও নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজে প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র ইলমি, আকীদাগত, ফিকহি, আধ্যাত্মিক ও দাওয়াতি চিন্তা-চেতনার ধারাবাহিক ঐতিহ্য। তাই উপমা করে বলা যায়—দেওবন্দী মাসলাক একটি চলন্ত জাহাজের মতো। এই জাহাজের চালক ব্যক্তি পরিবর্তিত হতে পারেন, যাত্রী প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরিবর্তিত হতে পারেন, কিন্তু জাহাজের মূল দিকনির্দেশনা ও ঐতিহ্য তার নিজস্ব পরিচয় বহন করে।

১৮৬৭ সালে ভারতের দেওবন্দে দারুল উলূম প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই ধারার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ নতুন মাত্রা লাভ করে। এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতভী, হাজী সৈয়দ মুহাম্মদ আবিদ দেওবন্দী, মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গোহীসহ একদল বিশিষ্ট আলেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দেওবন্দ কোনো ব্যক্তির নাম নয়

‘দেওবন্দী’ শব্দটি ভৌগোলিক একটি নাম থেকে উদ্ভূত হলেও সময়ের সঙ্গে এটি একটি বৃহৎ ইলমি ধারার পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। অক্সফোর্ডের একটি গবেষণাধর্মী পর্যালোচনায়ও দেওবন্দী পরিচয়কে শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নয়, বরং সুন্নি ইসলামের আধুনিক যুগের একটি স্বতন্ত্র চিন্তাধারার পরিমণ্ডল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে হানাফি ফিকহের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার এবং হাদিস অধ্যয়নের বিশেষ গুরুত্বকে এই ঐতিহ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গবেষণাটি সতর্ক করেছে যে, বিশ্বের সব ‘দেওবন্দী’ প্রতিষ্ঠান একই রকম নয়; ঐতিহাসিকভাবে এই ধারার ভেতরে বিভিন্ন মননশীলতা ও কর্মপদ্ধতির বৈচিত্র্যও রয়েছে।

সুতরাং কোনো একজন আলেম, কোনো একজন পীর, কোনো একজন রাজনৈতিক নেতা কিংবা কোনো একটি সংগঠনকে পুরো দেওবন্দী ঐতিহ্যের সমার্থক মনে করা ঐতিহাসিকভাবেও সঠিক নয়।
দেওবন্দী মাসলাকের মূল ভিত্তি কী?

দারুল উলূম দেওবন্দের নিজস্ব ঘোষণায় তাদের পথকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর অনুসরণ, হানাফি ফিকহের ব্যবহারিক পদ্ধতি এবং প্রতিষ্ঠাতা আকাবিরের মাশরাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের ভিত্তিতে দ্বীনি জ্ঞানচর্চা, আত্মশুদ্ধি, সুন্নাহর অনুসরণ এবং শরিয়তের প্রতি আনুগত্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ দেওবন্দী ঐতিহ্যকে শুধু একটি ‘রাজনৈতিক ঘরানা’ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত ব্যাপ্তি বোঝা যায় না। এর ভেতরে রয়েছে ইলম, অর্থাৎ কুরআন-হাদিস ও ইসলামী জ্ঞানচর্চা; ফিকহ, অর্থাৎ শরিয়তের বিধানকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বোঝার ঐতিহ্য; আকীদা, অর্থাৎ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর বিশ্বাসধারা; তাযকিয়া ও ইহসান, অর্থাৎ আত্মশুদ্ধি ও চরিত্রগঠন; সুন্নাহ, অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনপদ্ধতির অনুসরণ;
এবং দাওয়াত ও ইসলাহী প্রচেষ্টা, অর্থাৎ সমাজকে দ্বীনের দিকে আহ্বান। এই কারণেই দেওবন্দী ধারাকে একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের ‘চিন্তার কাফেলা’ বলা অধিক যুক্তিযুক্ত।

কওমী মাদরাসা: সমাজের নিজস্ব দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থা

বাংলাদেশের কওমী মাদরাসা ব্যবস্থা এই বৃহত্তর ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় প্রকাশ। সাম্প্রতিক একাডেমিক গবেষণায় বাংলাদেশের কওমী মাদরাসাকে দেশের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, এর বিকাশ স্থানীয় সমাজের সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

আরেকটি গবেষণায় কওমী মাদরাসাকে এমন একটি শিক্ষাধারা হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে ইসলামী জ্ঞানের প্রামাণিকতা, উলামায়ে কেরামের জ্ঞান-সনদ ও ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান-হস্তান্তরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অতএব কওমী সমাজ শুধু কিছু মাদরাসার সমষ্টি নয়। এটি আলেম, মাদরাসা, মসজিদ, খানকাহ, দাওয়াত, ইসলাহী মেহনত, ধর্মীয় শিক্ষা এবং সাধারণ মুসলিম সমাজের দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সম্পর্কের একটি বৃহৎ পরিমণ্ডল।

তাহলে ‘জাহাজের যাত্রী’ বলতে কী বোঝায়?

এখানেই মূল কথাটি।

যে ব্যক্তি দেওবন্দী চিন্তা-চেতনার মৌলিক শিক্ষা, আকাবিরের ইলমি উত্তরাধিকার, হানাফি ফিকহ, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর আকীদা, সুন্নাহর অনুসরণ, আত্মশুদ্ধি এবং উলামায়ে কেরামের ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন—তিনি এই ঐতিহ্যের যাত্রী হিসেবে পরিচিত হতে পারেন। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যখন স্বেচ্ছায় এমন একটি নতুন মতাদর্শিক বা সাংগঠনিক পরিমণ্ডলে চলে যান, যার নিজস্ব আকীদাগত, ফিকহি কিংবা মৌলিক চিন্তার কাঠামো দেওবন্দী ঐতিহ্য থেকে পৃথক, তখন তার নতুন পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার। কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়া আর দেওবন্দী হওয়া-না-হওয়াকে একেবারে একই বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কারণ দেওবন্দী ঐতিহ্য নিজেই কোনো একক রাজনৈতিক দল নয়। একজন আলেম বা দ্বীনি ব্যক্তি রাজনৈতিক বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করতে পারেন; কোনো দলকে সমর্থন বা সমালোচনা করাও রাজনৈতিক পরিসরের বিষয়। আসল প্রশ্ন হলো—তিনি কি দেওবন্দী আকীদা, ফিকহ, ইলমি ঐতিহ্য ও আকাবিরের মূল ধারার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখছেন, নাকি মৌলিকভাবে অন্য কোনো ধর্মীয় চিন্তাধারার পরিচয় গ্রহণ করছেন?

এই পার্থক্যটি না করলে ‘মাসলাক’ ও ‘দলীয় রাজনীতি’কে এক করে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়।

ব্যক্তি চলে যান, ঐতিহ্য থাকে

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ইলমি ঐতিহ্য দীর্ঘস্থায়ী।

আজ একজন আলেম কোনো অবস্থানে আছেন, আগামীকাল অন্য কেউ সেই দায়িত্বে আসবেন। একজন রাজনৈতিক নেতা জনপ্রিয় হতে পারেন, আবার সময়ের পরিবর্তনে তার জনপ্রিয়তা কমেও যেতে পারে। একটি সংগঠন শক্তিশালী হতে পারে, আবার ভবিষ্যতে দুর্বলও হতে পারে। কিন্তু একটি প্রজন্মের আলেমদের রচনা, শিক্ষাদান, ছাত্র তৈরি, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা এবং ইলমি উত্তরাধিকার বহু প্রজন্ম পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
দারুল উলূম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠার পেছনে যে ধারণাগুলো ছিল, তার মধ্যে সরকারি ক্ষমতার ওপর নির্ভর না করে জনসাধারণের অনুদান ও সহযোগিতার মাধ্যমে মাদরাসা পরিচালনার নীতিও উল্লেখযোগ্য।

অর্থাৎ এই জাহাজ কোনো একজন ব্যক্তির মালিকানাধীন নয়। এটি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক আমানত, যা এক প্রজন্ম অন্য প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়েছে।

দেওবন্দী পরিচয় কি শুধু পোশাক ও পরিচয়ের বিষয়?

কখনোই নয়।

দাড়ি, পাগড়ি, জুব্বা, মাদরাসার পদবি বা কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক—এসব বাহ্যিক পরিচয়ের অংশ হতে পারে; কিন্তু একটি চিন্তাধারার আসল পরিচয় তার ইলম, আকীদা, ফিকহ, আমল, আখলাক, সুন্নাহ-অনুসরণ এবং ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতায়। একইভাবে শুধু ‘দেওবন্দী’ নাম ব্যবহার করলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওবন্দী চিন্তার প্রকৃত প্রতিনিধি হয়ে যান না। বরং চিন্তা ও কর্মের সামঞ্জস্যই পরিচয়ের সত্যতা প্রকাশ করে।

মতভেদ থাকবে, কিন্তু ঐতিহ্যের শেকড় যেন না শুকায়

কওমী সমাজের ভেতরে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে। সাংগঠনিক বিভক্তি থাকতে পারে। নেতৃত্ব নিয়ে মতপার্থক্য হতে পারে। এমনকি কোনো কোনো বিষয়ে আলেমদের মধ্যে তীব্র বিতর্কও হতে পারে। এগুলো কোনো ঐতিহ্যের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না। বরং সুস্থ ঐতিহ্যের সৌন্দর্য হলো—মৌলিক বিশ্বাস ও ইলমি শিকড় অক্ষুণ্ণ রেখে বিভিন্ন বিষয়ে মতের বৈচিত্র্য সহ্য করা।

তাই কোনো ব্যক্তি একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে গেলেন বলেই তাকে গালি দেওয়া, হেয় করা কিংবা তাঁর সব দ্বীনি অবদান অস্বীকার করা যেমন অনুচিত; তেমনি রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে দেওবন্দী ঐতিহ্যের মৌলিক শিক্ষা ও আকাবিরের নীতিকে উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

আজকের কওমী সমাজের সামনে দায়িত্ব

আজ কওমী সমাজের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ব্যক্তিপূজা নয়—ইলমের প্রতি আনুগত্য, আকাবিরের উত্তরাধিকারের যথাযথ সংরক্ষণ এবং নীতির প্রতি অবিচলতা। আমাদের মনে রাখতে হবে, দেওবন্দী জাহাজের শক্তি কোনো একজন মাঝির হাতে নয়; এর শক্তি তার ইলমি নাবিকত্ব, ঐতিহাসিক শিকড় এবং প্রজন্মান্তরে চলমান জ্ঞান-সনদে। কেউ এই জাহাজে উঠে নেতৃত্ব দিতে পারেন, কেউ মাঝপথে নেমে যেতে পারেন, কেউ নতুন কোনো পথে যেতে পারেন। কিন্তু জাহাজ তার পথ হারায় না—যতদিন তার মূল নীতিগুলো জীবন্ত থাকে।

কওমী সমাজ কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। দেওবন্দী মাসলাক কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রতীক নয়। এটি একটি দীর্ঘ ইলমি ও ইসলাহী ঐতিহ্য, যার শিকড় উনিশ শতকের ভারতীয় মুসলিম সমাজে প্রোথিত হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে।

তাই ব্যক্তি বদলাবে, নেতৃত্ব বদলাবে, সংগঠনের নাম বদলাতে পারে, রাজনৈতিক অবস্থানও পরিবর্তিত হতে পারে—কিন্তু কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক ইলম, হানাফি ফিকহ, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদা, সুন্নাহর অনুসরণ, তাযকিয়া ও আকাবিরের ইলমি উত্তরাধিকার—এই মৌলিক ধারাই হবে পরিচয়ের আসল মানদণ্ড।

সেই অর্থে বলা যায়— “দেওবন্দী মাসলাক কোনো ব্যক্তির নাম নয়; এটি একটি ঐতিহ্যবাহী চলন্ত জাহাজ। যে ব্যক্তি এর ইলমি ও আদর্শিক পথের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন, তিনি এই কাফেলার যাত্রী। আর কোনো ব্যক্তি নিজের চিন্তা ও পরিচয়ের ভিত্তি পরিবর্তন করলে তার নতুন পরিচয় নতুনভাবে মূল্যায়িত হবে। কিন্তু জাহাজ চলতেই থাকবে—এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্ম, এক আলেমের পর আরেক আলেম, এক সময়ের পর আরেক সময়।”

কওমী সমাজের ভবিষ্যৎ তাই ব্যক্তির ওপর নয়, নীতির ওপর দাঁড়াক; নেতৃত্বের ওপর নয়, ইলমের ওপর দাঁড়াক; সাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনার ওপর নয়, আকাবিরের দীর্ঘ ইলমি আমানতের ওপর দাঁড়াক। তাহলেই এই ঐতিহ্যবাহী জাহাজ তার গন্তব্যের দিকে দৃঢ়ভাবে চলতে থাকবে।

বিষয়:

কাফেলা
এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL