জীবনের শেষ বেলায় এসে মানুষ সবচেয়ে বেশি যা চায় তা হলো একটু সঙ্গ, একটু সম্মান। অথচ আমরা তাদের দেই "বৃদ্ধাশ্রম" নামের একটা তকমা। শব্দটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে পরাজয় আর পরিত্যাগের গল্প। কিন্তু যারা আমাদের জন্ম দিলেন, হাঁটতে শেখালেন, বড় করলেন - তাদের প্রাপ্য কি এটা?
তাই আসুন, নামটা বদলাই। "বৃদ্ধাশ্রম" নয়, বলুন "বটবৃক্ষ নিবাস"।
বটগাছের কী মহিমা! শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। ঝড় আসে, রোদ আসে, তবু সে ছায়া দেয়। পাখি বাসা বাঁধে, পথিক জিরায়, শিশুরা খেলা করে। আমাদের দাদা-দাদি, নানা-নানিও তো তেমনই। তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা হলো শেকড়, তাদের উপদেশ হলো ডালপালা, আর তাদের ভালোবাসা হলো সেই স্নিগ্ধ ছায়া।
"আশ্রম" শব্দটা শুনলেই মনে হয় বিচ্ছিন্নতা। সমাজ থেকে আলাদা করে রাখার জায়গা। কিন্তু "নিবাস" মানে ঘর। আর "বটবৃক্ষ" মানে পরিবারের স্তম্ভ। তাই "বটবৃক্ষ নিবাস" মানে এমন একটি ঘর, যেখানে প্রবীণরা বোঝা নন, বরং সম্পদ।
এখানে সকাল শুরু হবে কুরআন তেলাওয়াত আর গীতার শ্লোক দিয়ে। দুপুরে নাতি-নাতনিরা এসে গল্প শুনবে "তোমার দাদু একাত্তরে কেমন যুদ্ধ করেছিল"। বিকেলে উঠানে হবে লুডু, দাবা, আর গানের আসর। এখানে থাকবে ডাক্তার, ফিজিওথেরাপি, লাইব্রেরি। কিন্তু সবচেয়ে বড় চিকিৎসা হবে - কেউ তাদের "বুড়ো" বলে ডাকবে না। ডাকবে "বটবৃক্ষ" বলে।
আমরা প্রযুক্তির যুগে অনেক এগিয়েছি। ফ্ল্যাট কিনি, গাড়ি কিনি। কিন্তু মা-বাবার জন্য সময় কিনতে পারি না। তাই বলে তাদের দূরে ঠেলে দেব? যে হাত আমাদের খাইয়ে দিয়েছে, সেই হাত আজ কাঁপছে বলে তাকে কি পর করে দেব?
"বটবৃক্ষ নিবাস" শুধু একটি নাম নয়, এটি একটি আন্দোলন। এটি আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। সরকার, সমাজসেবী ও তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম হোক "বটবৃক্ষ নিবাস"। ব্যানারে লিখা থাকুক - "এখানে অভিজ্ঞতার চাষ হয়"।
একদিন আপনার সন্তানও বড় হবে। সেও হয়তো ব্যস্ত হবে। সেদিন আপনি কী চাইবেন? একটি নীরব ঘর, নাকি একটি বটবৃক্ষের ছায়া?
তাই আজই শপথ নিই। শব্দে, কাজে, আচরণে আমরা প্রমাণ করি - আমাদের প্রবীণরা আবর্জনা নন। তারা বটবৃক্ষ। আর তাদের জন্য চাই বটবৃক্ষ নিবাস। যেখানে শেষ বয়সটা হবে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।