শিরোনাম

২৪শের আন্দোলনে শহীদ নাসির ছিলেন লক্ষ্মীপুর রায়পুরের কৃতিসন্তান

বাংলাদেশ যুগান্তর ডেস্ক বাংলাদেশ যুগান্তর ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
২৪শের আন্দোলনে শহীদ নাসির ছিলেন লক্ষ্মীপুর রায়পুরের কৃতিসন্তান ছবি: বাংলাদেশ যুগান্তর
২৪শের আন্দোলনে শহীদ নাসির ছিলেন লক্ষ্মীপুর রায়পুরের কৃতিসন্তান ছবি: বাংলাদেশ যুগান্তর

রায়েরবাগের এক সরু গলিতে বসবাস করতেন একজন নিরীহ মানুষ নাসির হোসেন। লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর থানার আশ্রাব নগরের শায়েস্তানগর গ্রামে তাঁর জন্ম ১৯৮৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। বাবা মো: রফিকুল ইসলাম একজন দরিদ্র কৃষক, মা নাজমা বেগম ছিলেন সংসার সামলানোর ছায়া। আট ভাই-বোনের মধ্যে নাসির ছিলেন সবার বড়। একজন ছায়াদার অভিভাবক, যার কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে ছিলেন পুরো পরিবারটি। লেখাপড়ার হাতছানি ছেলে-বেলায় থাকলেও তা টিকেনি দীর্ঘদিন।

সংসারের অভাবে তাকে নামতে হয় ভাতের সন্ধানে। ঢাকায় এসে হয়ে ওঠেন পেশাদার দর্জি, সুতি কাপড় কেটে মানুষের গড়ন বুঝে তৈরি করতেন পোশাক। কিন্তু নিজ গড়নের মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক যোদ্ধার হৃদয় নাসির রাজনীতির ময়দানে নাম লেখাননি, পোস্টার টানাননি, মাইক হাতে বক্তৃতা দেননি কখনো। কিন্তু ২০২৪ সালের আন্দোলন তাঁকে ডেকে নেয় নীরবে। ছাপাখানার ভেতর থেকে সরাসরি রাজপথে। শহরের আনাচে কানাচে রাষ্ট্রীয় দমননীতি আর লাশের খবরে তাঁর ভিতরের মনুষত্ববোধ টা জেগে ওঠে।

ছাত্রীদের উপর পাশবিক নির্যাতন, নিরস্ত্র তরুণদের গুলি করে হত্যা আর গণহত্যার সংবাদে তিনি আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। রায়েরবাগ নিজের দর্জির দোকান সামলেও তিনি সক্রিয় থাকতেন আন্দোলনের লজিস্টিক সহায়তায়। কখনো রান্না করে খাওয়াতেন ছাত্রদের। কখনো ঠাণ্ডা পানি নিয়ে ছুটতেন ব্যারিকেডের পেছনে। ১৯ জুলাইয়ের দিনটিতে তিনিও ছিলেন মাঠে সেদিন।  

২০ জুলাই, যাত্রাবাড়ি রায়েরবাগ মোড়ে শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা করে পুলিশ। মুহূর্তের মধ্যে ছত্রভঙ্গ হয় ছাত্র-জনতা। সেই বিশৃঙ্খলার মাঝে পুলিশ গুলি চালায় নাসিরের মাথা ও মুখে গুলি লাগে।  নিথর দেহ পড়ে থাকে রাস্তায় রাজপথের মাঝে কিছুক্ষণ। পরে উদ্ধার করে নেওয়া হয় মুগদা জেনারেল হাসপাতালে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ জুলাই ভোরে মৃত্যু হয় শহীদ মো: নাসির হোসেনের। তবে শুধু তাঁর মৃত্যুই নয়, এর পরবর্তী ঘটনা প্রবাহও ছিল নির্মম। পরিবারের পিছু নেয় পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামীপন্থী গুন্ডারা। চিকিৎসায় বাধা, দাফনে ভয়ভীতি, কবরস্থান কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহ সব কিছু পার হয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁকে দাফন করা হয় যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল কবরস্থানে। বড় ভাইয়ের রক্তমাখা জামাটা আজও ভাঁজ করে তুলে রেখেছেন ছোট ভাই জিলানী।

আর গর্ভধারিনী মা, যিনি প্রতিদিন জামাটা বুকের কাছে টেনে নেন, যেন সোনার মানিক একটু ফিরে আসে। নাসিরের মৃত্যুর পর পরিবার একেবারে ভেঙে পড়ে। বাবা এখনও দিন-মজুরের কাজ করেন। এক ভাই বেকার, দুই বোন স্কুল-কলেজে পড়েন। তাদের সকলের বুকে আজও এক অপূর্ণতা নাসির শুধু ভাই ছিলেন না, ছিলেন আশ্রয়। বোনেরা বলেন, তিনি ছিলেন একজন বটবৃক্ষ, যাঁর ছায়ায় তারা বেঁচে ছিলেন নিরাপদে। এখন সে ছায়া নেই, আছে কেবল শোক, আর একটিই দাবী এই হত্যার বিচার হোক, যেন নাসিরের রক্ত বৃথা না যায়।

আজ শহীদের তালিকায় লেখা আছে নাসির হোসেনের নাম একজন দর্জি, যিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি জনতার প্রতিনিধি। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে, যেমন মনে রেখেছে মুন্সি মেহেরুল্লাকে, ও শহিদ নুর হোসেনকে। কারণ যখন দেশ হাঁকে, সাড়া দেয় সেই যাঁর হৃদয়ে আছে সর্বোচ্চ ভালোবাসা প্রাণ দিয়ে দেশকে বাঁচিয়ে তোলার অঙ্গীকার।

আল্লাহ আপনাকে শহীদি মর্যাদা দান করুন।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL