ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সরকার পতনের পর সারাদেশে যখন চরম প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল এবং ৮ আগস্ট রাতে বঙ্গভবনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল—ঠিক সেই মুহূর্তে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভায় একদিনেই সই হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকার উন্নয়ন চুক্তি।
সংরক্ষিত সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট গোয়ালন্দ পৌরসভার প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিট (PIU) কার্যালয়ে বসে ৩টি পৃথক সড়ক উন্নয়ন প্রজেক্টের মোট ৩ কোটি ৯২ লাখ ১ হাজার টাকার চূড়ান্ত চুক্তিপত্রে একই দিনে সই করেছেন পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফেরদৌস আলম খান।
১ দিনে ৪ কোটি টাকার ৩টি চুক্তি: সংগৃহীত ই-জিপি নথি অনুযায়ী, 'গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়)'-এর আওতায় গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫টি প্যাকেজের মধ্যে ৩টি বড় প্যাকেজের চুক্তি একই দিনে সই করা হয়:
টেন্ডার আইডি ৯৫৮৫৩৯: ৯৭ লাখ ৯২ হাজার ৩৬৭ টাকার কাজ পায় নীলু শেখের পাড়ার 'সোফিয়া কনস্ট্রাকশন'।
টেন্ডার আইডি ৯৫১৪১৬: ১ কোটি ৫৬ লাখ ৪৮ হাজার ৪১১ টাকার কাজ পায় চাউল বাজারের 'মেসার্স এস.আর এন্টারপ্রাইজ'।
টেন্ডার আইডি ৯৫৮৫ ৩৮: ১ কোটি ৩৭ লাখ ৬০ হাজার ২১৭ টাকার কাজ পায় পৌর জামতলার 'মোল্লা এন্টারপ্রাইজ'।
১০ মাস পরের কাজের চুক্তি ৭ আগস্টেই কেন? অফিশিয়াল নথিতে দেখা যায়, এই ৩টি প্রজেক্টেরই 'কাজের সম্ভাব্য শুরুর তারিখ' (Proposed Contract Start Date) দেওয়া হয়েছে ২০২৫ সালের ১ জুন!
যে কাজের সূচনা হওয়ার কথা চুক্তি সইয়ের প্রায় ১০ মাস পর (২০২৫ সালের জুনে), সেই কাজের চুক্তিপত্র সরকার পতনের পরদিন ২০২৪ সালের ৭ আগস্টেই সই করার যৌক্তিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিলে বিগত সরকারের আমলে প্রক্রিয়াকৃত ফাইল বাতিল হতে পারে—এমন আশঙ্কায় ক্ষমতার শূন্যতার সুযোগ নিয়ে সরকারি বাজেট ই-জিপিতে লক করে রাখতেই তড়িঘড়ি সই করা হয়েছে।
ব্যাংক বন্ধের মাঝে সিকিউরিটি জমার ধোঁয়াশা: সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ই-জিপিতে চুক্তি সইয়ের আগে বিজয়ী ঠিকাদারকে ব্যাংকে গিয়ে ১০% পারফরম্যান্স সিকিউরিটি বা পে-অর্ডার জমা দিতে হয়। ৫ থেকে ৭ আগস্ট সারাদেশে ব্যাংক লেনদেন ও স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদাররা কীভাবে ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিলেন এবং প্রকৌশলী তা কীভাবে যাচাই করলেন—তা নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য, ৭ আগস্টের চুক্তি সই ও ব্যাংক সিকিউরিটি বিষয়ে গোয়ালন্দ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফেরদৌস আলম খান বলেন, "অফিস খোলা থাকলে চুক্তিপত্রে সই-স্বাক্ষর হতেই পারে। তবে ব্যাংক বন্ধ থাকলেও ঠিকাদারের পারফরম্যান্স সিকিউরিটির কাগজপত্র ব্যাংক খোলার তারিখেই হওয়ার কথা। ফাইলপত্র না দেখে তো এভাবে বলা কঠিন, আমি কাগজপত্র দেখে জানাবো।"
তবে ফাইল দেখে বিস্তারিত তথ্য জানানোর কথা বলে সময় নিলেও পরবর্তীতে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে উনার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি আর রিসিভ করেননি। উনার নম্বরে লিখিত খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।